শিরোনাম: শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিবৃতি
তারিখ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ (প্রেস বিজ্ঞপ্তি)
বাংলাদেশের সফল সরকার প্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনা আজকে এক বিবৃতিতে বলেন, মহান শহিদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বাংলাসহ বিশ্বের সকল ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাঙালি জাতির আত্মত্যাগ বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। বাঙালি জাতির মুক্তি-সংগ্রামের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই একটি অসম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের ভিত রচিত হয়েছিল। ১৯৫২ সালের এ দিনে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা’র মর্যাদা রক্ষা করতে প্রাণোৎসর্গ করেছিলেন আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম, রফিকউদ্দিন আহমদ, শফিউর রহমানসহ আরও অনেকে। আমি বাংলাসহ বিশ্বের সকল ভাষা-শহিদগণের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। সেই সঙ্গে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেতৃত্বদানকারী সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল ভাষাসংগ্রামী, যাঁদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ এবং সংগ্রামের বিনিময়ে আমাদের মা, মাটি ও মানুষের মর্যাদা সমুন্নত হয়েছে।
১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ বাঙালির গৌরবময় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস যুগে যুগে আমাদের জাতীয় জীবনে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করছে। জাতির পিতা ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বারবার কারাবরণ করেছেন। ১৯৪৭ সালের ২৭ নভেম্বর করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত হয়। ঢাকায় এ খবর পৌছা মাত্রই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খাজা নাজিমুদ্দিনের বাসভবনের সামনে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করে। এর কিছুদিন পরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র শেখ মুজিব তাঁর সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ঢাকায় ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে গণপরিষদের ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে এক সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবটি প্রত্যাখান করে খাজা নাজিমুদ্দিন আইন পরিষদে ঘোষণা দেয়, পূর্ব বাংলার জনগণকে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিতে হবে। কিন্তু নাজিমুদ্দিনের এই হঠকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিস ও অন্যান্য দলের সমন্বয়ে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ১১ মার্চের ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে শেখ মুজিবসহ অনেক ভাষাসৈনিক সচিবালয়ের সামনে থেকে গ্রেফতার হন এবং ১৫ মার্চ মুক্তি পান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সভায় সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জিন্নাহ ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে উর্দুর পক্ষে বক্তব্য রাখে এবং ২৪শে মার্চ কার্জন হলে আয়োজিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা দিলে ছাত্ররা তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করে।
ভাষা আন্দোলনকে জাতীয় আন্দোলনে রূপদান করতে শেখ মুজিব দেশব্যাপী সফরসূচি তৈরি করে ব্যাপক প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেন এবং সভা-সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। তিনি ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর থেকে গ্রেফতার হন এবং ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি মুক্তি পান। ১৯ এপ্রিল আবার গ্রেফতার হয়ে জুলাই মাসে মুক্তি পান। এরপর তিনি ১৯৪৯ সালের ১৪ অক্টোবর গ্রেফতার হয়ে ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান শেখ মুজিব ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ থেকেও ভাষাসৈনিক ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন এবং আন্দোলনকে বেগবান করতে নানা পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ তিনজন দূত মারফত খবর পাঠান- ২১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী হরতাল ডাকতে হবে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রতিষ্ঠা’ ও রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে শেখ মুজিব আমরণ অনশন ঘোষণা করলে ১৬ ফেব্রুয়ারি কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে ঢাকা থেকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তরিত করে।
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি পূর্ব-বাংলা ব্যবস্থাপক পরিষদের বাজেট অধিবেশনের জন্য নির্ধারিত ছিল। শেখ মুজিবের পরামর্শ ও নির্দেশ অনুযায়ী ঐদিন সারাদেশে সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করে এবং সেখানে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে কতগুলো তাজা প্রাণ নিমেষেই ঝরে পড়ে, অনেকে আহত হন, অনেকে গ্রেফতার হন। ২২ ফেব্রুয়ারি হরতাল পালিত হয়। ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা গঠন করে, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়, প্রথম ২১শে ফেব্রুয়ারি-কে শহিদ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, এই দিনে সরকারি ছুটি ঘোষনা করে এবং শহিদ মিনার তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করে। দুর্ভাগ্য, ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সামরিক শাসন জারির ফলে সেই আকাঙ্ক্ষাগুলো আর পূরণ হয়নি।
বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির পিতা সকল দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ দেন। তিনি সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করেন। জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে আমাদের মাতৃভাষাকে বিশ্ব সভায় মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে কানাডা প্রবাসী রফিক এবং ছালাম নামে দু’জন বাংলাদেশী কয়েকজন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সদস্য মিলে ‘মাতৃভাষা সংরক্ষণ কমিটি’ গঠন করে। ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উদ্যাপনের জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাব প্রেরণ করে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছি। বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় ভাষা সংরক্ষণ ও তাদের মর্যাদা রক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলাম। তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করেছিলাম। ২০১৭ সাল থেকে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল বইসহ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে বিতরণ করে আসছিলাম।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, মহান ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর আদর্শকে ধারণ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সর্বদা রাজনীতি করে আসছে এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। আর এজন্যই বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক সকল ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছিল। দারিদ্র্য ৪১শতাংশ থেকে কমে ১৮.৭ শতাংশে এবং অতিদারিদ্র্য ২৫ শতাংশ থেকে ৫.৬ শতাংশে নেমে এসেছিল। বাংলাদেশ সারা বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত ছিল। অথচ সেই বাংলাদেশ আজ কোথায়? আইএমএফের ঋণের কিস্তি পাওয়ার জন্য শর্ত পূরণ করতে পারে না। খুনি ফ্যাসিস্ট ইউনূস সরকারের ৬ মাসে অসংখ্য শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, ৭১ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ কমে গেছে। কোটি কোটি মানুষ বেকার হয়ে গেছে। কোনো কর্মসংস্থান নেই। আওয়ামী লীগের সময়ে নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য যে সব সরকারি সুযোগ-সুবিধা চালু ছিল তা একের পর এক বাতিল করা হচ্ছে। বছরের ২ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও পাঠ্যপুস্তক হাতে পায়নি শিক্ষার্থীরা। কবে নাগাদ পাঠ্যপুস্তক দিতে পারবে তাও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না শিক্ষা উপদেষ্টা। এই অবৈধ দখলদার ফ্যাসিস্ট ইউনূস সরকারের নিকট শিক্ষার কোনো গুরুত্ব নেই। যারা শিক্ষার গুরুত্ব দেয় না, তারা নিশ্চিতভাবে ভাষার মর্যাদাও রক্ষা করতে জানে না। অন্যদিকে মানুষের বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার ও মুক্ত চিন্তা করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরা হয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রতিনিধিরা ও তাদের দোসররা সংবাদমাধ্যমগুলোর অফিসে অফিসে গিয়ে হুমকি-ধমকি ও সংবাদ প্রকাশের প্রেসক্রিপশন দিয়ে আসছে। অথচ ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের অবারিত দ্বার উন্মুক্ত করেছিলাম। আজ এই ফ্যাসিবাদী শক্তি ও জঙ্গিগোষ্ঠী সকল উন্মুক্ত দ্বার বন্ধ করে দেশের জনগণকে অবরুদ্ধ দশার মধ্যে নিপতিত করছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি একেবারেই তলানিতে। মানুষের জানমালের কোনো নিরাপত্তা নেই। যেখানে চিন্তার স্বাধীনতা নেই, যেখানে মানবতা বিপন্ন সেখানে ভাষার উৎকর্ষ সাধিত হবে এ ধরনের চিন্তা বাতুলতা মাত্র। এই ফ্যাসিবাদী রাক্ষসগোষ্ঠীর হাতে কোনো কিছুই নিরাপদ নয়। আমাদের মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষাসহ সবকিছুই আজ ক্ষত-বিক্ষত ও বিপর্যস্ত। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মানুষের উপর দমন-পীড়ন চালিয়ে কোনো দানবীয় শক্তি ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে নি। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা এই রাক্ষসদের করালগ্রাস থেকে আমাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করব এবং ভবিষ্যতে উন্নত-সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশের বিনির্মাণ করব, ইনশাল্লাহ।
|| চয়ন পাল (নিজস্ব প্রতিবেদক), সাপ্তাহিক ক্রাইম দর্পন ||
Author Profile

Latest entries
BangladeshMarch 7, 2025ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার বাণী
BangladeshFebruary 24, 2025নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কায় মানুষ; কী করছে পুলিশ, সেনা ও র্যাব
BangladeshFebruary 20, 2025শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিবৃতি
BangladeshFebruary 9, 2025“শেখ হাসিনা সরকারের পরে বিচারবহির্ভূত হত্যা যেভাবে ঘটতেছে”